Friday, November 1, 2013

Halloween in Bangladesh (in Bangla)



বাংলাদেশেও হ্যালোউইন পালিত হচ্ছে
লিজি রহমান


বাংলাদেশে এখন নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। আর তা হলো, হ্যালোউইন ডে উদযাপন করা। খুব বেশীদিন হবে না, বাংলাদেশে ভালেন্টাইনস ডে শুরু হয়েছে। যাকে বলা হয় ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’। যদিও ভালেন্টাইনস ডে’র উপত্তি হয়েছে ধর্মীয় কারণ থেকে। সেইন্ট ভালেন্টাইনসের প্রতি সন্মান জানানোর জন্য পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে পোপ গেলাসিয়াস ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে ভালেন্টাইনস ডে' হিসেবে ঘোষণা করেন। সময়ের ক্রমাবর্তনে এই দিনটি এখন ভালবাসা প্রকাশের জন্য একটি সামাজিক দিবসে পরিণত হয়েছে। এর ধর্মীয় কোন প্রকাশ বা আবেদন এখন আর নেই। সব ধর্মের মানুষই এই দিনে ভালবাসার বর্হিপ্রকাশ ঘটান। তাই বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ভালেন্টাইনস ডে নিয়ে মাতামাতি করলেও তা আশ্চর্য লাগেনি। আশ্চর্য লাগছে হ্যালোউইন উদযাপনের কথা শুনে।

হ্যালোউইন তো পুরোই একটি ধর্মীয় উসব এবং কুসংস্কারের দিন। হ্যালোউইনের উপ্তত্তি হয়েছে সেল্টিক প্যাগান (মূর্তি পূজারী)দের কাছ থেকে। সেল্টিকরা বিশ্বাস করতেন বছরের প্রথম দিনটিতে মৃত ব্যক্তিদের আত্মা এবং প্রেতাত্মারা কবর থেকে উঠে আসে। তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তখন তাদেরকে নানাবিধ খাবার দিতেন তারা। এই ভোজ তখন আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস সহ বৃটেনের আরো কিছু স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল। বৃটেনে খৃষ্টধর্মের প্রসারের সাথে সাথে এর আদলটা বদলে দেয়া হলো। নভেম্বরের এক তারিখে খৃষ্টানদের অল সেইন্টস ফীষ্ট বা ভোজের দিন। আর অক্টোবরের ৩১ তারিখে সেই ভোজের আগের দিন বা ইভ অব অল সেইন্টস ডে, যার আরেক নাম ‘অল হ্যালো’জ ইভ’। সেই কারণে এই দিনটি 'হ্যালোউইন' নামে পরিচিত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আধুনিক হ্যালোউইন ডে’র শিকড় সেই মূর্তিপূজারী প্যাগান এবং খৃষ্টধর্ম – দু’য়ের মধ্যেই প্রোত্থিত।

এখন হ্যালোউইন ডে’ ইউরোপ এবং আমেরিকায় একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় দিবস। এদিনটিতে শুধু ছোট ছেলেমেয়েরাই নয়, বড়রা পর্যন্ত বিভিন্ন সাজে সেজে থাকেন। মহল্লায় মহল্লায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে ভৌতিক সাজে বাড়ি সাজানোর ধূম পড়ে যায়। শুরুতে আইরিশ ইমিগ্র্যান্টরা আমেরিকায় 'জ্যাক ও’ল্যান্টার্ন' বা বিশাল আকারের মিষ্টিকুমড়ো কার্ভিং করে তার ভেতরে মোমবাতি জ্বালিয়ে বাড়ির সামনে রাখতেন। এখন কেবল জ্যাক ও’ল্যান্টার্নই নয়, যে যতো ভৌতিক সাজে বাড়ি সাজাতে পারেন সে চেষ্টা করেন। নিউউয়র্কে যেসব এলাকা মুসলমানপ্রধান, সেসব এলাকায় অধিকাংশ বাড়ি হ্যালোউইনে নিরাভরণ থাকলেও খৃষ্টানপ্রধান এলাকার বাড়িগুলো অক্টোবরের শুরু থেকেই নানা সাজে সেজে ওঠে। দোকানগুলো ক্যান্ডি, কস্টিউম এবং হ্যালোউইনের বিভিন্ন সামগ্রীতে ভরে ওঠে। বড়রা ব্যাগ বোঝাই করে নানা ধরণের ক্যান্ডি কিনে ঘরে রাখেন। কারণ সন্ধ্যে হলেই পাড়ার বাচ্চারা নানাসাজে সেজে বাড়িতে বাড়িতে ক্যান্ডির জন্য হানা দেবে। তাদের কণ্ঠে সমস্বরে ধ্বনিত হবে, “ট্রিক অর ট্রিট স্মেল মাই ফিট, গিভ মি সামথিং গুড টূ ইট...ইফ ইউ ডোন্ট, আই ডোন্ট কেয়ার, আই উইল পুল ইয়োর আন্ডারওয়্যার।“
 
হ্যালোউইনের শুরুতে এই “ট্রিক অর ট্রিটের” প্রচলন না থাকলেও এর সূচনা হয় অনেক পরে। ১৯৪২ সালে আমেরিকাতে। ১৯৫০ সালের দিকে এটি জনপ্রিয়তা পায়। কিশোর-কিশোরীরা এইদিনে দুষ্টুমীতে মেতে ওঠে। মানুষকে ভয় দেখানো, পথচারীদের দিকে ডিম ছুঁড়ে দেয়া ছাড়াও সহায়-সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি করে থাকে। অফিসে অফিসে পার্টি হয়, স্কুলগুলোতে পার্টি ছাড়াও প্যারেড হয়।

ঊনিশ শতকে স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড থেকে আগত অভিবাসীরা আমেরিকায় হ্যালোউইন ডে’ উদযাপনের সূচনা করেন। বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এই প্রথা বা ঐতিহ্য ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্টুরিকো, নিউজিল্যান্ডসহ বৃটেনের সর্বস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। আর আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বাংলাদেশেও হ্যালোউইন ডে’র প্রসার ঘটল। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে হ্যালোউইন পালন করলেও মনে রাখতে হবে, এসব দেশের মানুষ মূলত খৃষ্টধর্মের অনুসারী। তারা তাদের ধর্মের একটি ঐতিহ্য পালন করছেন মাত্র, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশী, সেখানে হ্যালোউইনের মতো একটি দিন পালন করা কি যুক্তিযুক্ত হচ্ছে?

ফেসবুকের কল্যাণে বেশ বাংলাদেশের কয়েকটি স্কুলে হ্যালোউইন পালনের ছবি চোখে পড়ল। বাচ্চারা নানা ভৌতিক সাজে সেজে আনন্দ করছে আর তাদের মায়েরা হিজাব মাথায় পাশে বসে তা উপভোগ করছেন। তাদের ক্ষীণতম ধারণা নেই যে তারা কিসের মধ্যে সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছেন! আমরা যারা আমেরিকায় থাকি, আমাদের উপায় নেই হ্যালোউইন থেকে দূরে থাকবার। ক্রীসমাসের মতো  হ্যালোউইনেও আমাদের চারিপাশ উৎসব মুখর হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়ের কথা ভেবে আমাদেরকে হ্যালোউইনে শামিল হতে হয়। হ্যালোউইনের কস্টিউম আর ক্যান্ডি কিনতে হয়, বাচ্চাদের নিয়ে ট্রিক অর ট্রিটিংয়ে যেতে হয়। যস্মিন দেশে যদাচার। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশের মানুষের কি অজুহাত আছে?  

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খোদ আমেরিকার স্কুলগুলোতে পর্যন্ত হ্যালোউইন পালন করা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এমন কি কোন কোন স্কুলে হ্যালোউইন উদযাপন নিষিদ্ধও করে দেয়া হয়েছে। আর তার কারণ একটিই, হ্যালোউইন একটি ধর্মীয় পরব। যেখানে কিনা আমেরিকায় স্কুলগুলোতে হ্যালোউইন বন্ধ করার কথা উঠেছে, সেখানে কিনা বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে মহাসমারোহে হ্যালোউইন পালিত হচ্ছে। এভাবে না বুঝে অন্যের রীতি-আচার অনুকরণ করা কি ঠিক কাজ হচ্ছে?
নভেম্বর ১, ২০১৩

No comments:

Post a Comment