আমেরিকান ড্রিম(৬ষ্ঠ পর্ব)
অবশেষে সময় হলো
লিজি রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সেদিন রেবেকার সাথে দেখা
হবার পর থেকে মাথায় কেবল তার কথাই ঘুর ঘুর করছিল। মনে হচ্ছিল, যেমন করেই হোক সময়
বার করে একদিন রেবেকার সাথে দেখা করতেই হবে। কিন্তু কবে যে দেখা করতে পারবো বুঝে
উঠতে পারছিলাম না। সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করি, একদিন মাত্র ছুটি করি। ছুটির দিন সারা রাজ্যির
কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা, সারা সপ্তাহের বাজার-সদাই কেনা,
রান্না-বান্না, লন্ড্রি, সব এই একদিনেই করে রাখতে হয়। অন্যদিনগুলোতেতো কাজের শেষে
ঘরে ফিরে আর কোনদিকে তাকানোর সময় পাওয়া যায়না। ক্লান্তি আর অবসন্নতা ছাড়াও আছে সময়ের
অভাব। সামাজিকতার পাট বলতে গেলে এক রকম ছেড়েই দিয়েছি। কাজ আর ঘর করেই কুলোতে
পারছিনা। তাই কখন যে রেবেকার সাথে দেখা করতে যাব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অথচ
ওর সাথে দেখা করার জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে।
রেবেকা কলেজে আমার এক ক্লাশ সিনিয়র
ছিলেন, সেইসূত্রে তার সাথে পরিচয়। পাবনা থেকে হাইস্কুল পাশ করে মাত্র প্রথম বারের
মতো ঢাকা শহরে এসেছি। শহরের মেয়েদের চালচলনই আলাদা। তখনই তাকে দেখে মুগ্ধ
হয়েছিলাম। অন্য মেয়েদের মতো তার মধ্যে মোটেই নাকউঁচু ভাব ছিল না। কালচারাল
সেক্রেটারী হিসেবে কলেজের কালচারাল প্রোগ্যামগুলোতে তার ছিল সক্রিয় ভূমিকা। বিয়ে
হয়েছিল ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই। বর বিদেশ খাকতেন। তখন তো বিদেশ বলতে ছিল একমাত্র
লন্ডন। তাই পোশাকে-আশাকে তখনই অন্য মেয়েদের চেয়ে একটু আলাদা ছিলেন তিনি। সব সময় সুন্দর
সুন্দর কাপড় পরতেন, আর সেজেগুজে থাকতেন। অন্যদের মতো হিসেব করে টাকা খরচ করতেন না।
পড়াশোনায় ভাল রেজাল্ট করার ইচ্ছে ছিল না তা বোঝাই যেত। শুনেছিলাম ভিসা পেলে
রেবেকাও লন্ডন চলে যাবেন। শুধু অপেক্ষায় আছেন। যতোদিন বরের কাছে যাওয়া না হয়,
ততদিন কলেজের খাতায় নাম রাখা। তাই কলেজে এলেও ক্লাশের বাইরে হৈ চৈ করেই বেশী সময়
কাটাতে পছন্দ করতেন। আর তাই মৌমাছির মতো তার সহপাঠীরা এবং আমাদের মতো নীচের
ক্লাশের মেয়েরা তাকে সবসময় ঘিরে থাকত। ক্লাশের অবসরে কলেজের ক্যাফেটেরিয়া বা গেটের
পাশে ফুচকাওয়ালার পাশে সাঙ্গোপাঙ্গো পরিবেষ্টিত অবস্থায় প্রায়ই তাকে চোখে পড়ত। একবার
কলেজের সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন নির্বাচনী প্রচারণা করতে
গিয়ে আমাদের বাড়িতেও এসেছিলেন। এরপর থেকেই তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা।
সেসময় লন্ডনের ভিসা পাওয়া খুবই কঠিন ছিল।
অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও শেষ পর্যন্ত রেবেকা ভিসা পেলেন না। ফলে তার আর লন্ডনে
যাওয়া হলোনা। কলেজের পাট শেষ করার পর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। দেখা গেল
আমরা দুজনই একই বিভাগে ভর্তি হয়েছি। ইতিহাস বিভাগ। ভার্সিটিতে ইংরেজী পাঠ্যপুস্তক
ছিল। রেবেকার মতো আমি ইংরেজীতে ভালো ছিলাম না। তাই পড়াশোনার ব্যাপারে তার
স্মরণাপন্ন হতাম মাঝে মাঝেই। দীর্ঘ দু’বছর পর তার বর দেশে চলে এসেছেন। ভার্সিটির
পাট শেষ হবার পর রেবেকার সাথে আমার আর দেখা হয়নি। বিয়ে হয়েছে আমার, স্বামীর
কর্মস্থল আখাউড়া চলে যেতে হয়েছে আমাকে। প্রথম দিকে চিঠিপত্রে যোগাযোগ থাকলেও পরে
তা আর ধরে রাখতে পারলাম না। তবে বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত রেবেকার অনুষ্ঠান শুনতাম।
বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের সাক্ষাতকার নিতেন, স্ক্রিপ্ট পড়তেন। ভাল লাগত তার সুমধুর কণ্ঠে সুন্দর উচ্চারণে কথাগুলো শুনতে।
এরমধ্যে দীর্ঘদিন কেটে গিয়েছে। রেবেকার
সাথে আবার দেখা হল আমেরিকায় আসার পর। এই নতুন দেশে এসে যখন হিমশিম খাচ্ছি, তখন এক
অনুষ্ঠানে তার সাথে দেখা। যেমনটি ভেবেছিলাম, তেমনটিই হয়েছেন তিনি। সেই আগের মতো সুন্দরী,
সুবেশা, ভক্ত পরিবেষ্টিত। কথাবার্তায় চৌকষ, ইংরেজী তো আগে থেকেই জানতেন, এখন তা
আরো ক্ষুরধার হয়েছে। আগের মতোই স্বাধীন, স্বাবলম্বী। দেখে ভালো লাগলো যে এখনও তিনি
আগের মতো হৈচৈ করতে পছন্দ করেন। আমাকে দেখে রেবেকা সেদিন আন্তরিকভাবেই খুশী
হয়েছিলেন।
আমি তখন ওপি ওয়ান ভিসা নিয়ে দেশ থেকে
সদ্য আমেরিকা এসেছি। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় এসে উঠেছি। কাউকে ভালো করে
চিনি না, নিউইয়র্কের পথঘাটও তেমন চিনি না। বন্ধু-বান্ধবও সে রকম গড়ে ওঠেনি। দেশে
থাকতে কোনদিন চাকরী করিনি। আর চাকরী করার প্রয়োজনও হয়নি। স্বামী ভাল সরকারী চাকুরে
ছিলেন, চাকর-বাকর খাটিয়ে খেয়েছি, নিজের হাতে কাজ করার অভ্যেসও তেমন নেই। বাইরে কি
করে কাজ করব? একেতো ইংরেজী্তে মোটেই ভালো নই, তারওপর কোনদিন চাকরীও করিনি যে, কোন
অফিস তো দূরের কথা, কোন গ্রোসারী স্টোরও আমাকে কাজ দেবে না। আর দিলেও আমি কাজে
টিঁকবো না। আমার স্বামীরও সেই একই অবস্থা। সে ইংরেজী জানলেও তার দেশের ইংরেজী
শুনলে এখানে কেউ কাজ দিতে চায় না। কোথাও কোন কাজ না পেয়ে বেচারা হাইওয়ের কাছে
খবরের কাগজ বিক্রির কাজ ধরেছে। ভোর পাঁচটা থেকে সকাল দশটা পর্যন্ত পথের মোড়ে
দাঁড়িয়ে কাগজ বিক্রি করে। ট্র্যাফিক লাইটে গাড়িগুলো দাঁড়ালেই কাগজের বান্ডিল হাতে
তাদের দিকে ছুটে যায়। পঞ্চাশ সেন্টস একটা কাগজের দাম, তাও সবাই তা কেনে না। সব
মিলিয়ে ক’ টাকাই বা ঘরে আসতো? শীতের দিন বলেই বোধহয় কাজটা সে পেয়েছিল। এই প্রচন্ড
শীতে একঠায় বাইরে দাঁড়িয়ে কাগজ বিক্রি করা কি যা তা কথা নাকি? তবু একেবারে কিছু না
করার চেয়ে একটা কিছু করা ভালো।
রেবেকার সাথে যোগাযোগ হবার পর আমরা সেই
রাহুর দশা থেকে মুক্তি পেলাম। আমেরিকায় আমার সেই প্রথমদিকের অসহায় দশা কাটিয়ে উঠতে
তিনি নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। ক’জন মানুষই বা পারে এভাবে নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে
সাহায্য করতে? তিনি তখন স্কুলে চাকরী করছেন। সবাই তাকে শিক্ষক হিসেবে জানলেও আমাকে
বলেছেন, তিনি আসলে পুরোদস্তুর শিক্ষক নন। প্যারাপ্রফেশনালের চাকরী করছেন। তবে
নিয়মিত কলেজে যাচ্ছেন, নিজেকে শিক্ষক হিসেবে তৈরি করছেন। তিনি জ্যকসন হাইটসে এক
পরিচিত শাড়ির দোকানে আমাকে সেলসগার্লের কাজ জোগাড় করে দিলেন। তখন অনেক বাঙ্গালি
জ্যাকসন হাইটস থেকে বাজার করতেন। তাই অনেক দোকানের মালিকই বাঙ্গালি সেলসগার্ল
রাখতেন। বেতন বেশী না হলেও কাজটা আরামের। আর অভিজ্ঞতা হলে পরে ভাল বেতনে অন্য
কোথাও কাজ নেয়া যাবে। আমার স্বামীকেও তার এক পরিচিত ল’অফিসে ঢুকিয়ে দিলেন। অনেক বাঙ্গালি
ক্লায়েন্ট তাদের। এই অফিসেই নাকি রেবেকা এক সময় কাজ করেছেন। এখন সেখানে আরো দু’জন
বাঙ্গালি কাজ করে। কাজটা পেয়ে সে বেঁচে গেল।
তখন থেকে আমি রেবেকার আরো বেশী অনুরাগী
হয়ে পড়লাম। তাকে দেখে অন্যরা ঈর্ষা করলেও আমার কিন্তু কখনোই ঈর্ষা হতো না, বরং ভাল
লাগত। আর আমার এই নিঃস্বার্থ অনুরাগের কথা তার অবিদিত ছিল না। তাই নিঃসংকোচে আমাকে
অনেক সুখদুঃখের কথা বলতেন। তাই দেখা-সাক্ষাত কম হলেও রেবেকার সাথে এক ধরণের
আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে উঠেছিল। আর সেটা হয়েছিল বোধহয় এই প্রবাসে বসবাস করার জন্যই।
তাই এখন রেবেকার এমন বিষন্ন মুখোভাব আর সাদামাটা বেশভূষা দেখে কি হয়েছে জানার জন্য
অস্থির হয়ে পড়লাম। এর পেছনে কোন খারাপ উদ্দেশ্য বা অহেতুক কৌতুহল কাজ করছে না।
অল্পদিনের মধ্যেই একটা সুযোগ এসে গেল।
আমাদের দোকানের পাশে ওয়াটার পাম্প বার্স্ট হয়ে সেদিন পুরো ব্লক পানিতে প্লাবিত হয়ে
গেল। ঊপায় না দেখে মালিক দোকান বন্ধ করে দিলেন। আমি বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে এই
সুযোগটা কাজে লাগালাম। কুইন্সগামী ‘আর” ট্রেনে উঠে বসলাম। রেবেকার ঠিকানা আমার
হাতব্যাগেই ছিল। জ্যাকসন হাইটসে নেমে ঠিকানা খুঁজে যে বাড়িতে তিনি উঠেছেন, সে
বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। রেবেকা বাড়িতেই ছিলেন। আমাকে দেখে কেমন যেন একটা
লজ্জামিশ্রিত আনন্দ পেলেন বলে মনে হল। অবশ্য আমার অনুমান ভুলও হতে পারে।
উচ্ছ্বসিত হয়ে একসাথে অনেক প্রশ্ন করে
ফেললাম। জানতে চাইলাম, দুলাভাই কোথায়? ছেলেমেয়েরা কি পড়ছে? কি প্ল্যান এখন?
চাকরী-বাকরী খুঁজছেন কিনা? বাসা পেয়েছেন কিনা!
রেবেকারা যে বাড়িতে উঠেছেন, সেই বাড়ির ভাবী
আমাকে চা খাবার জন্য জোরাজুরী করলেও রেবেকা বাধা দিলেন। বললেন, চা থাক ভাবী। লোপার
এতো কথার জবাব দিতে তো অনেক সময় লাগবে। আবহাওয়া ভাল আছে আজ, আর আমারও একটু
কেনাকাটা আছে। আমরা বরং বাইরে ঘুরতে ঘুরতে কথা বলি। কাজও হবে, কথাও হবে।
(চলবে)
No comments:
Post a Comment