Thursday, October 24, 2013

American Dream (Part-1)

American Dream-1 (Rebecca's Strength)



আমেরিকান ড্রিম (১ম পর্ব)
রেবেকার মনোবল
 লিজি রহমান

তাকে দেখলে অনেকেই ঈর্ষান্বিত হয়। আমেরিকার নাগরিকত্ব আছে, ভাল চাকরী করেন, অনরগল শুদ্ধ ইংরেজীতে কথা বলতে পারেন। পোশাকেও কোন জড়তা নেই, শাড়ি, স্কাট বা স্ল্যাকস - যখন যেখানে যেটা মানায়, সেটা পরেন। শুধু কি তাই? কম্পিউটার প্রফিসিয়েন্ট, গাড়ি চালানোতে সিদ্ধহস্ত। শুধু নিঊইয়র্কই নয়,  নিঊইয়র্কের বাইরের শহরগুলোতে পযন্ত তার স্বাচ্ছন্দ্য চলাফেরা।  ছেলেমেয়েরা সাবালক হয়েছে। একজনের পড়াশোনার পাট শেষ, আরেকজনেরও প্রায় শেষের পথে। মোটামুটি দাড়িয়ে গেছে তারা। সেদিক থেকেও তিনি অনেকের ঈর্ষার পাত্রী। এ রকম ঝাড়া হাত-পা কজন মহিলা আছে? এদেশে এসে তো সবাই প্রথমেই বাচ্চা নিয়ে নেয়। প্রথম কয়েক বছর কাটে সেই বাচ্চাদের বড় করার কাজে। এছাড়া, নিঊইয়র্কের বাঙ্গালী সমাজে সংস্কৃতিসেবী হিসেবেও তার যথেষ্ট পরিচিতি আছে। টাকা-পয়সা, চলাফেরা, বা কোন কাজেই তিনি কারুর অপর নির্ভরশীল নন। পুরোপুরিভাবে আত্মনির্ভরশীল সুসজ্জিতা এই মহিলা স্বাধীন চলাফেরা দেখে মহিলারা তো বটেই, পুরুষরা পর্যন্ত ঈর্ষান্বিত না হয়ে পারেন না। আমেরিকান ড্রিম যেন তার করায়ত্ত। সবুজ পাত্তির (গ্রীন কার্ড) চিন্তা নাই কিনা, তাই এতো ভাল চাকরী করতে পারছেনগ অনেকেই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাবেন, আহা, আমিও যদি এ রকম স্বাধীন হতে পারতাম! কী সৌভাগ্য নিয়েই না মহিলা এদেশে এসেছিলেন!!
কিন্তু তারা কেঊ একবারও ভাবেন না, খুব কম মানুষই সোনার চামুচ মুখে নিয়ে আমেরিকায় আসেন। তারপর সৌভাগ্য নিজ থেকে কারো হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয় না।  সৌভাগ্যকে ধরতে হয়। সৌভাগ্যের পেছনে দৌড়াতে হয়, তবেই না সে ধরা দেয়। যার কথা বলছি, তার নাম...ধরা যাক তার নাম রেবেকা। রেবেকার সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের, তাই তার প্রথম জীবনের সংগ্রামমুখর দিনগুলোর কথা আমার অজানা নয়। তবে তা ছিল খন্ড খন্ড চিত্র, তাই পুরো ছবিটা পাবার জন্য রেবেকাকে কিছু প্রশ্ন করতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে যে ছবিটা পেলাম, তা হলোঃ

প্রায় পচিশ বছর আগে যখন রেবেকা আমেরিকায় আসে, তখন তার অবস্থাও হয়েছিল অনেকটা কুয়োর ব্যাঙের মতো। তখন বাংলাদেশ থেকে আগত অধিকাংশ বাঙ্গালির গন্তব্যস্থলই ছিল নিঊইর্ক। রেবেকাও তাই করল। সেসময় নিঊইয়র্কে বাঙ্গালির সংখ্যা এখনকার মতো এতো বেশী না হলেও একেবারে কম ছিল না। কিন্তু তাদের কারুর সাথে রেবেকার পরিচয় ছিল না, তারাও কেঊ রেবেকাকে চিনতেন না। দেশের সংস্কৃতিজগতে যে যতসামান্য পরিচিতিকে পূঁজি করে আমেরিকায় এসেছিলেন, দেখা গেল তা কোন কাজে লাগল না। আশা ছিল দেশের বেতার, টিভির পরিচয়ের কারণে সবাই তাকে কিছুটা গুরুত্ব দেবে, কিন্তু তা হল না বলে মনে কিছুটা হতাশা থাকলেও সবচেয়ে বেশী হতাশ হলেন, কাজ খুঁজতে গিয়ে। দেশে থাকতে একটি বিদেশী দূতাবাসে চাকরী করতেন, কাজ চলনসই ইংরেজী বলতে পারতেন, তাই মনে ভরসা ছিল, নিঊইয়র্কের অফিসপাড়ায় একটি ভদ্রগোছের চাকরী পেয়ে যাবেন। পত্রিকা দেখে অফিসে অফিসে দরখাস্ত দেয়াই সার হল। হাঁটাহাঁটি করার অভ্যেস নেই, তারপর ম্যানহাটানের অফিসপাড়ায় ঘুরে ঘুরে জুতোর শুকতলী ক্ষয়ে ফেললেন, কিন্তু কোন কাজ পেলেন না। পরিচিত দু'একজনের রেফারেন্স নিয়ে কয়েকটি অফিসে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাতেও কোন কাজ হল না। 

এরপর ঊপায়ান্তর না দেখে অডজব খঁজতে লাগলেন। পরিচিত এক বাঙ্গালি তার রেস্টুরেন্টের মালিককে বলে সেখানে এক কাজ জোগাড় করে দিলেন, কিন্তু সে কাজে একবেলাও টিকলেন না। কাজটা ছিল টেলিফোনে অর্ডার নেবার, কিন্তু যখন ফোনে ঠিকানা লিখতে গিয়ে রেবেকা রাশ আওয়ারে অনেক সময় নিয়ে নিল। কোন রাস্তার নামই তার জানা নেই, তাই কাস্টমারকে বানান জিজ্ঞেষ করতে হচ্ছিল, আর তাতেই মালিক ক্ষেপে গিয়ে তাকে সরিয়ে কাঊন্টারে বসিয়ে দিল। সেখানেও রেবেকা সুবিধে করতে পারছিল না। ওকে সময়ক্ষেপণ করতে দেখে মালিক ওকে তক্ষুণি বিদেয় করে দিল। এরপর আরেক বাঙ্গালির সুপারিশে লং আইল্যান্ডে এক নার্সিংহোমে কাজ জুটল। বাড়ি থেকে অনেক দূরে। প্রতিদিন দু'তিনটি বাস ধরে সেখানে যেতে হতো। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা রেখে সকাল থেকে সন্ধা অবধি কাজ করতে হতো। গালভরা নাম কাজের, ডায়েটিশিয়ান, আসলে কাজ করতে হতো কিচেনে। রোগীদের কার্ড মিলিয়ে ট্রেতে খাবার সাজানোই ছিল তার আসল কাজ। কাঊ খায় সলিড খাবার, কেঊবা পিঊরে বা গলা খাবার, কেঊবা খায় লিকুইড বা তরল খাবার। দু'বেলা বিশাল ট্রলিতে খাবার সাজিয়ে রুমে রুমে গিয়ে বুড়ো-বুড়িদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে হতো, খাওয়া শেষে সেসব ট্র নিয়ে আসতে হতো। বাকি সময় কিচেন পরিষ্কার করতে হতো। বেতন ছাড়া ফ্রি খাওয়া পেত - এইটুকুই যা সুবিধে ছিল। কিন্তু প্রতিদিন এতদূর যাতায়াত করা আর এত কষ্টের কাজ করতে গিয়ে রেবেকার আমেরিকান স্বপ্ন ভেঙ্গে চূরমার হয়ে যাচ্ছিল। এই কাজ করার জন্যই কি তিনি আমেরিকা এসেছিলেন? এদিকে দেখতে দেখতে রেবেকার ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, আর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এদেশে অবৈধ হয়ে যাবেন, তখন কোন ভাল কাজ পাওয়াই মুষ্কিল হয়ে পড়বে। যদিও তার স্বামী একটি রেস্টুরেন্টে মোটামুটি ভাল বেতনে কাজ করছেন, রেবেকা চাকরী না করলে তাদের দিন আটকে থাকবে না, তারপরওআজীবন আত্ননির্ভরশীল রেবেকা আসন্ন বেকারত্বের আশংকায় ম্রিয়মান হয়ে গেলেন। 

ঠিক এই সময় পরিচিত এক বাঙ্গালির কাছ থেকে খবর পেলেন, ইউনাইটেড নেশন্সে বাতসরিক অধিবেশনের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে লোক নেয়া হচ্ছে। তার সাথে গিয়েই একদিন সেখানে গিয়ে চাকরীর ফর্ম ফিলআউট করে টাইপিং টেস্ট দিয়ে এলেন রেবেকা। অত্যন্ত সন্মানজনক চাকরী, রেবেকা যেমনটি চেয়েছিলেন, ঠিক তেমনটি। বা তার চেয়েও বেশী। ন'টা পাঁচটার চাকরী। জাতিসংঘের কর্মচারীরা আমেরিকান সরকারকে ট্যাক্স দেয় না, ফলে বেতনের পুরো টাকাটাই হাতে আসবে। মাস শেষে পুরো দু'হাজার ডলার। যদিও অস্থায়ী কাজ, তবে অধিবেশন চলাকালীন জাতিসংঘ থেকেই ভিসা দিয়ে দেবে, অবৈধ হবার ভয় থাকবে না। আর পরেও এখানে কাজ পাকা হবার সম্ভাবনা আছে। এ যেন রেবেকার কাছে স্বপ্নের চাকরী। এ কাজটা পেয়ে গেলে আর তাকে পায় কে! 
টাইপিংয়ে স্পীড ভাল থাকায় রেবেকার ভাগ্যে সত্যি শিকে ছিড়ল, তিনি কাজটা পেয়ে গেলেন। প্রেস সেকশনে টাইপিস্টের কাজ। চাকরী হবার খবর পেয়ে একদিনের নোটিসে  নার্সিংহোমের কাজে ইস্তফা দিয়ে দিলেন রেবেকা।  জাতিসংঘে অস্থায়ী কাজ করতে করতেই রেবেকা সেখানে স্থায়ী কাজের জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। পেয়েও গেলেন, কিন্তু বিধি বাম। দেশে যেসব বিদেশী দূতাবাসে তিনি কাজ করেছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই রেফারেন্স হিসেবে তাদের নাম দিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের একজন ওর নামে খারাপ রিপোর্ট দেয়ায় জাতিসংঘের স্থায়ী চাকরীটা রেবেকার হল না। রিপোর্টটা ছিল, রেবেকা আমেরিকায় এসে না জানিয়ে আর চাকরীতে ফিরে যাননি। যদিও ঘটনা পুরোপুরি সত্য নয়, রেবেকা তার বসকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন তিনি আর দেশে ফিরবেন না, তিনি সে চিঠি পার্সোনাল ডিপার্টমেন্টকে না দেয়ায় এই বিপত্তি। রেবেকা যোগাযোগ করে এই বিভ্রান্তি দূর করতে পারলেও জাতিসংঘের পাকা চাকরীটা তার আর হলনা। রেবেকার তিনমাসের বাদশাহী শেষ হয়ে গেল। থেমে গেল তার ভাল উপার্জন। শেষ হয়ে গেল তার সম্নানজনক চাকরীটি। চূর্ণ হয়ে গেল তার আমেরিকায় বৈধভাবে থাকার স্বপ্ন। নিভে গেল সুন্দর ভবিষ্যতের আশার আলো। অন্য আরো শত শত বাঙ্গালির মতো রেবেকাও আমেরিকার মাটিতে অবৈধ হয়ে গেলেন।

(চলবে)

No comments:

Post a Comment