আমেরিকান ড্রিম (৩য় পর্ব)
রেবেকার মনোবল
লিজি রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমেরিকায় আসার পর এতোগুলো বছর কাজের চাপে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল করতে পারেননি রেবেকা। যখন এসেছিলেন তখন মেয়েটার বয়স ছিল পাঁচ বছর আর ছেলেটার বয়স ছিল সাড়ে তিন বছর। আসার পর থেকেই কাজের সন্ধান করা আর আর কাজ নিয়ে প্রতিদিন বাইরে বাইরে থেকেছেন। তারপর গত চারটি বছর যাবত এই ল'অফিসে কাজ করছেন। একেতো ন'টা পাঁচটার চাকরী, তারওপর ট্রেনে করে ম্যানহাটানে যাওয়া আসাতে যেত আরো
বাড়তি দু'ঘণ্টা। তারওপর প্রায়ই ইচ্ছের বিরুদ্ধে ওভারটাইম করতে হয়। এছাড়া আরো আছে সংসারের কাজ। সব ছেড়ে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খোঁজখবরও
ঠিকমতো নিতে পারতেন না, ওদের হোমওয়ার্কে সাহায্য করাতো দূরের কথা। ওরা স্কুল থেকে ফিরে তিন/চার ঘণ্টা বেবীসিটারের কাছে সময় কাটায়। সেখানে ওদের কিভাবে সময় কাটে, কে জানে! কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রেবেকা ওদেরকে তুলে নিয়ে আসেন। রেবেকার কোনদিনই ইচ্ছে ছিল না বাচ্চাদের বেবীসিটারের কাছে রাথার, কিন্তু ঊপায়ান্তর না দেখেই রাথতে হয়েছে। স্বামী আমেরিকায় আসার কিছুদিন পর থেকে সেইযে একই
রেস্টুরেণ্টে কাজ করছেন, গ্রীনকার্ড পাবার পরও সেটা ছাড়েননি। ছুটি করেন সপ্তাহে একদিন, তাও আবার সোমবার, যেদিন কিনা বাচ্চারা স্কুলে। প্রতিদিন দুপুর থেকে নিয়ে
মধ্যরাত অবধি তার কাজ। ঘরে আসতে আসতে রাত বারোটার ওপর হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ছেলেমেয়েদেরকে কোন সময় দেয়া তার পক্ষে একেবারেই সম্ভব না। এমন কি উইকেন্ডেও নয়। রেবেকার
তাই অনেকদিনের ইচ্ছে, স্কুলে শিক্ষকতা করবেন। স্কুলে কাজ করলে ছেলেমেয়ের সাথে
একই সময়ে ঘরে ফেরা যাবে, ওদের প্রতি পুরোপুরি খেয়াল দেয়া যাবে। কিন্তু
গ্রীনকার্ড বা সিটিজেনশীপ না থাকলে স্কুলে কাজ করা যায়না। তাই এতোদিন বাধ্য হয়েই একাজ করেছেন। এখন আর তাকে আটকায় কে? তাই আমেরিকায় ফিরেই রেবেকা সিটি জবের জন্য আবেদন করলেন।
নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুলগুলো সব বোর্ড অব এডুকেশনের অধীনে, আর বোর্ড অব এডুকেশন হচ্ছে নিউইয়র্ক সিটির অধীনে। রেবেকা সত্যি একদিন ব্রুকলীনে গিয়ে বোর্ড অব এডুকেশনের অফিসে হাজির হলেন। যা জানতে পারলেন, তা হলো সরাসরি শিক্ষক হওয়া এতো সহজ ব্যপার নয়, এরজন্য আরো পড়াশোনা এবং লাইসেন্স থাকতে হয়। তবে শিক্ষকদের সহকারী হওয়া অনেক সহজ। বাংলাদেশের ইন্টারমিডিয়েট পাশ হলেই হয়। বাংলাদেশের মাস্টার্স পাশ এদেশের ব্যাচেলার্স পাশের সমতূল্য। তা দিয়ে অবশ্য সাবস্টিটিউট টিচারের কাজ পাওয়া যাবে। সাবস্টিটিউট টিচাররা হলো ঠেকা টিচার। যথন কোন নিয়মিত শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন, কেবলমাত্র তখনই তাদের ডাক পড়ে। কোন নির্দিষ্ট স্কুল নয়, একেক দিন একেক স্কুলে যেতে হয়। একেতো এদেশে পড়াশোনার কোন অভিজ্ঞতা নেই, ক্লাশরুমের ভেতরে কখনো ঢুকে দেখননি, তার ওপর পথঘাট ভালো চেনেননা, ইংরেজী ভাষায়ও পুরোপুরি দখল আসেনি, তাই হঠাত করে টিচিংয়ে ঢুকতে রেবেকার ভরসা হলো না। সাব্যস্ত করলেন প্রথম দিকে টিচারের সহকারী হিসেবেই কাজ করবেন। পুরোদস্তুর শিক্ষক না হলেও কাছাকাছি তো! তার ওপর সিটিজব। বেনিফিট পাওয়া যাবে অনেক, যা কিনা এতোগুলো বছর পাননি। আর কাঊকে না বললেই হলো, শিক্ষক বলে চালিয়ে দিলে কেইবা বুঝবে? পরে পড়াশোনা করে, সার্টিফিকেট বের করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেবেন। সেই অনুযায়ী ফর্ম পূরণ করে দিয়ে এলেন রেবেকা।
অল্পদিনের মধ্যে বোর্ড অব এডুকেশম থেকে চিঠি এলো, রেবেকার চাকরী হয়ে গেল। প্রথমে কিছুদিন সাবস্টিটিউট হিসেবে কাজ করতে হবে, তারপর পাকা কাজ পাবে। সেই চিঠি পেয়ে ল'অফিসের কাজে ইস্তফা দিল। ততোদিনে ল'অফিসের সবার সাথে তার একটি বিনিসূতোর আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে। প্রচুর বাঙ্গালি ক্লায়েন্ট রোল্যান্ড এবং এমি গেলের। সেসময় নিউইয়র্কে প্রচুর বাঙ্গালির আগমন ঘটেছে। তখন সবাই ভিজিট ভিসায় এসে আমেরিকায় থেকে যেত, তারপর নানাভাবে আমেরিকায় বৈধ হবার চেষ্টা করতো। তখন তাদের লইয়ারের স্মরণাপন্ন হতে হতো। অধিকাংশই পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করত। তাদের সেইসব আবেদনপত্র পূরণ করতেন রেবেকা, শুধু লইয়ারের কাছে তাদের কথা বাংলায় বুঝিয়ে বলাই নয়, অনেক সময় তাদের সাথে কোর্টেও যেতে হত। ক'জন বাঙ্গালি মেয়ে তখন এ রকম অফিসে কাজ করে! বাইরে কোথাও এইসব ক্লায়েন্টদের সাথে দেখা হয়ে গেলে তারা রেবেকাকে দারুণ সন্মানের সাথে গ্রহণ করতেন। এছাড়া, সাংস্কৃতিক জগতেও ততোদিনে রেবেকার নামডাক অনেক ছড়িয়েছে। সব মিলিয়ে অফিসে রেবেকা অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন, তাই তার বিদায় উপলক্ষ্যে তার বস এমি গেল ম্যানহাটানের এক রেস্টুরেন্টে বিশাল এক পার্টি দিলেন।
তিনদিন বিভিন্ন স্কুলে সাবস্টিটিউট হিসেবে কাজ করার পর রেবেকা ফুলটাইম কাজের অফার পেল। এদেশে শিক্ষকরা হলেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল'ইয়ারের মতো প্রফেশনাল, তাই সহকারী শিক্ষকদের বলা হয় প্যারাপ্রফেশনাল। সংক্ষেপে প্যারা। দায়িত্ব খুব কম, ছাত্র বা ছাত্রীর দেখাশোনা করা, তাদেরকে ক্লাশ ওয়ার্কে সাহায্য করা, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া, পরিষ্কার করা, ব্রেকফাস্ট এবং লাঞ্চের সময় সাহায্য করা। দেশে থাকতে রেবেকার কোন ধারণা ছিল না স্পেশাল এডুকেশন কি। চাকরীর ফর্ম ফিলআউট করার সময় এসব শর্ত লেখা থাকলেও তখন ঠিক বুঝতে পারননি। চাকরীতে ঢোকার পর বুঝলেন স্পেশাল এডুকেশন কাকে বলে।
শারিরীক বা মানসিকভাবে যেসব শিশু খুব বেশী বিকলাংগ, তাদেরকে রেগুলার স্কুল বা ক্লাশে দেয়া হয় না, তাদের জন্য আলাদা স্কুল আছে। আবার অনেক স্কুলের মধ্যে আলাদা ক্লাশ আছে। এদের অনেকেই ঠিকমতো হাঁটতে পারেনা, অনেকেই হুইলচেয়ারে করে স্কুলে আসে। কেউ কেউ এম্বুলেন্সে করে স্কুলে আসে। কারো সাথে অক্সিজেন ট্যাংক থাকে। স্কুলে তাদের জন্য দু'জন নার্স সদা মোতায়েন থাকলেও কারো কারো সাথে নিজস্ব নার্স থাকে, কারণ কখন তাদের শারিরীক অবস্থার অবনতি হয়ে পড়ে তা বলা যায়না। এছাড়া, স্কুলে শিক্ষক ছাড়াও তাদের জন্য স্পীচ টিচার, অকুপেশনাল থেরাপিষ্ট, ফিজিক্যাল থেরাপিষ্ট আছে। এরা কেঊ রেগুলার ছাত্র-ছাত্রীদের মতো পাঠ্যপুস্তক নিয়ে পড়াশোনা করেনা। বড় বড় ছেলেমেয়েরা হাইস্কুলে ক্লাশ করলেও তাদেরকে শিশুদের উপযোগী বই পড়ানো হয়। খুব কম ছেলেমেয়ের কথাই বোঝা যায়, কেঊ কেঊ তো কথাই বলতে পারেনা। বাকিরা আকারে ইঙ্গিতে কথা বলে। কেঊ পুরোপুরি অন্ধ, কেউ বা সামান্য আলোর রেখা দেখতে পায়, কেউ ঝাপসা দেখে, আরো কতকি! কেউবা বদ্ধ উন্মাদ।
সাবিং করার সময় দ্বিতীয় দিন ডিস্ট্রিক্ট-৭৫ এর একটি হাইস্কুলে ডাক পড়েছিল রেবেকার। তখন তিনি জানতেননা ডিস্ট্রিক্ট-৭৫ মানেই খুব বেশী বিকলাংগ ছাত্রছাত্রীদের স্কুল। তবে প্রথমদিন চারিদিকে এইসব বিকলাংগ কিশোর-কিশোরীকে দেখে ঘৃণা হবার পরিবর্তে রেবেকার মনে সমবেদনা জেগেছিল। দেশে তিনি কখনো একসাথে এতো বিকলাংগ ছেলেমেয়েকে দেখেননি। সেইসাথে নিজের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী দুটো ফুটফুটে সুন্দর ছেলেমেয়ের কথা ভেবে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করেছিলেন। এইসব ছেলেমেয়ের বাবা-মায়েদের না জানি কতো কষ্ট! কাজের ফাঁকে দু'একজনের সাথে সে কথা আলাপও করেছিলেন। তখন কি আর জানতেন, তারা কারা! পরে জেনেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন সে স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। সেজন্যই সেই স্কুলে মাত্র দুদিন কাজ করার পরই রেবেকাকে তিনি পার্মানেন্ট চাকরী দিয়ে দিলেন। প্যারার কাজ করতে গিয়ে আর একটি সুবিধে পেলেন রেবেকা, তা হলো বিনে পয়সায় পড়াশোনা করার। ছয় ক্রেডিট পর্যন্ত
পড়াশোনার খরচ বোর্ড অব এডুকেশন থেকে দেয়। এই সুযোগ হাত ছাড়া করলেন না
রেবেকা। কাছের একটি কলেজে ভর্তি হয়ে গেলেন। পার্টটাইম পড়তে লাগলেন। অল্প অল্প করে পড়ে এডুকেশনে ক্রেডিটগুলো নিতে হবে। রেবেকা তার আসল
উদ্দেশ্য থেকে তিনি বিচ্যূত হননি, সেটা হলো পুরোদস্তুর একজন শিক্ষক হওয়া। একটি গুণ রেবেকার ছিল, তা হলো যখন যে কাজটি তিনি করেছেন, তা মন দিয়েই করেছেন। ছোট কাজ বলে কখনো কোন কাজকে তিনি অবহেলা করেননি। তবু মাঝে মাঝে মনে হতো, প্যারার কাজটা আসলে বেবীসিটিংয়ের কাজ।
(চলবে)
No comments:
Post a Comment