আমেরিকান ড্রিম (৫ম পর্ব)
আবার হলোতো দেখা
লিজি রহমান
লিজি রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
মাঝখানে প্রায়
চার বছর কেটে গিয়েছে, এরমধ্যে আর রেবেকার সাথে আমার যোগাযোগ হয়নি। লোকমুখে ছাড়া
ছাড়াভাবে তার খবর পেয়েছি বৈকি, কিন্তু সরাসরি তার সাথে কোন কথা হয়নি। নিউইয়র্কে প্রচুর
বাঙ্গালির আগমন ঘটেছে। গ্রীক, ইটালিয়ানরা যারা আগে এই শহরে বসতি গেড়েছিলেন, তারা
এখন বাড়িঘর বিক্রি করে এই ব্যস্ত শহর ছেড়ে নিরিবিলি অঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছে। প্রথমে পানির
দামে বাড়ি বিক্রি হলেও দেখতে দেখতে এই চার বছরের মধ্যে বাড়ির দাম শুধু দ্বিগুণই
নয়, তিন/চার গুণ বেড়ে গিয়েছে। আর বাড়বে নাই বা কেন, আমাদের দেশী ভাইয়েরাই বাড়ির যা
দাম, তার চেয়েও বেশী দাম দিয়ে বাড়ি কিনে নিচ্ছে। কয়েকটি এলাকা তো বাঙ্গালি প্রধান
হয়ে উঠেছে। আগে প্রতিটি নেইবারহুডেই শাদা-কালো-বাদামী-হলুদ সব ধরণের মানুষই বাস
করতো। কোন কোন এলাকা শ্বেতাংগ প্রধান ছিল, কোন এলাকা ছিল কৃষ্ণাংগ প্রধান, আবার
কোন এলাকা বা ছিল চৈনিক প্রধান। তাদের মধ্যে মিলে-ঝিলে বাংলাদেশীরা বাস করতো।
কিন্তু খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে নিউইয়র্কের কয়েকটি এলাকা বাঙ্গালি প্রধান হয়ে উঠল।
বিশেষ করে এস্টোরিয়া, জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটসের কিছু এলাকায় ভিন্ন বর্ণের হাতে
গোণা কিছু মানুষ দেখা গেলেও বাঙ্গালিই বেশী দেখা যায়।
দশ/পনেরো বছর
আগেও নিউইয়র্কে ট্রেনে কোন বাঙ্গালির দেখা পেলে বর্তে যেতাম, আর এখন ট্রেনে উঠলে
মনে হয় বাংলাদেশের কোন ট্রেনে উঠেছি। বাঙ্গালি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও হয়েছে অনেক। আগে
আমাদের মহল্লায় (এস্টোরিয়ায়)একটি
মাত্র বাংলাদেশী গ্রোসারী ছিল। আশীর দশকে এদিকে ওদিকে একটি দুটি গ্রোসারী শপ হলেও
এখনতো পাড়ায় পাড়ায় দেশী গ্রোসারী হয়েছে। বাঙ্গালির সংখ্যাবৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলা
পত্রিকা, সংগঠন, রেস্টুরেণ্ট, শিল্পী, জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ – সবকিছুর সংখ্যাই বেড়েছে। প্রথমদিকে
বিভিন্ন কর্ম-কাণ্ডে মানুষ রেবেকার অভাব অনুভব করলেও ধীরে ধীরে তিনি বিস্মৃতির
চাদরে ঢাকা পড়ে গেলেন। নতুনরা তার স্থান দখল করে নিল। এক সময় নতুনদের ভিড়ে তার কথা আর কারুরই মনে রইল না।
এদিকে আমার জীবনেও
অনেক পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। সংসারের খরচ বেড়েছে। নিউইয়র্কে জীবনযাপনের ব্যয়
বেড়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনে কলুর বলদের মতো পরিশ্রম করেও কোনদিক সামাল দিতে
পারছিলাম না। অনেকেই বাড়ি, এলাকা বা স্টেট বদলালেও আমরা এস্টোরিয়ার যে বাড়িতে
ছিলাম, সেই বাড়িতেই রয়ে গেছি। আমার মন থেকেও রেবেকার স্মৃতি অনেকটা ঝাপসা হয়ে
গেছে। মাঝে মধ্যে এরওর মুখে যা খবর পেয়েছি, তাতে ধরে নিয়েছি, তিনি নিউ মেক্সিকোতে
বিশাল বাড়ি নিয়ে স্বামী আর ছেলেময়েদের নিয়ে নিশ্চয় সুখেই আছেন। ছেলেমেয়েও বড়
হয়েছে, মেয়ে হাইস্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। স্কলারশীপ নিয়ে কলেজে পড়ছে।
ছেলেও হাইস্কুলের শেষ প্রান্তে আছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার পাট শেষ হয়ে গেলে আর কি
চিন্তা! ছেলেমেয়ের সুশিক্ষাই তো আমাদের কাম্য। দেশে সেশন জট, পড়াশোনার অধোগতি,
ছাত্র রজনীতি, শিক্ষার ব্যয়বহুলতা, আরো কতো ঝামেলা। কেবলমাত্র ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত
ভেবেই তো আমরা বাঙ্গালিরা এতো কষ্ট সয়েও আমেরিকার মাটি কামড়ে পড়ে থাকি। এদেশে স্কুলের
পড়াশোনা ফ্রি হলেও ছেলেমেয়ের কলেজের খরচ জোগাতে গিয়ে অভিভাবকরা প্রাণান্ত হয়ে যান। আর
সেখানে কিনা রেবেকার মেয়ে স্কলারশীপ নিয়ে পড়ছে! ওরা পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই ভাল ছিল, শুধু তাই নয়, ছেলেমেয়েদুটোর ব্যবহারও ছিল
দেখার মতো। এই ভিনদেশী পরিবেশে বড় হয়েও আদব-কায়দা, কথা-বার্তায় কখনো তাদের কোন
খুঁত খুঁজে পাইনি। রেবেকা যেভাবে আদর, শাসন, সুশিক্ষা এবং সময় দিয়ে ছেলেমেয়েকে মানুষ
করেছেন, তাতে করে তিনি একজন আদর্শ এবং সফল মা বললেও ভুল হবেনা।
প্রায় চার বছর
পর একদিন কার মুখে যেন খবর পেলাম রেবেকারা নিউইয়র্কে ফিরে এসেছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম বেড়াতে এসেছেন, কিতু তা নয়, তারা নাকি নিউ
মেক্সিকোর পাট একেবারে গুটিয়েই চলে এসেছেন। শুনে প্রথমটায় বিশ্বাস হয়নি। তারপর যখন
বিশ্বাস হলো তখন অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও তার ঠিকানা জোগাড় করতে পারলাম না।
কিছুদিন পর হঠাৎ করে একদিন লেক্সিংটন এভিনিউ সাবওয়ে স্টেশনের ভেতরে রেবেকার সাথে দেখা হয়ে গেল। আমি কাজে যাব বলে চার নাম্বারট্রেনের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম। রেবেকা ছয় নাম্বার ট্রেন থেকে নেমে কুইন্সগামী 'আর' ট্রেন ধরার জন্য নীচে যাচ্ছিলেন। রেবেকাকে প্রথমটায়
চিনতে আমার একটু দেরী হয়েছিল। আগের সেই রেবেকা আর নেই। আগের মতো ছিপছিপে নেই। স্বাস্থ্য আগের চেয়ে বেশ ভাল হয়েছে, একটু মুটিয়ে
গেছেন বলা চলে। পোশাকে-আশাকে আগের সেই জৌলুষ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, আগের মতো সেই উচ্ছলতাও
দেখলাম না। কেমন একটা ক্লান্ত ভাব তার চোখে-মুখে। আমার ট্রেন যে কোন সময় এসে যাবে, তবুও
রেবেকার সাথে কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না। ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই কিছুক্ষন তার সাথে কথা বললাম। প্রথমেই জানতে চাইলাম, কোথায় বাসা নিয়েছেন। রেবেকা
জানালেন, এখনো বাসা নেননি। জ্যাকসন হাইটসে পরিচিত একজনের বাড়িতে উঠেছেন। তবে বাসা
খুঁজছেন।
রেবেকার ঠিকানা নিতে নিতেই আমার ট্রেন এসে গেল। খুব শীগগিরই দেখা করতে যাবার
প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমি দৌড়ে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন মিস করলে কাজে দেরী হয়ে যাবে।
আর এদেশে কাজে দেরী হলে কাজ হারাতে হবে। চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম রেবেকার বিষন্ন মুখ। ঠিক করলাম, দু’একদিনের
মধ্যেই রেবেকার সাথে দেখা করতে যাব।
(চলবে)
No comments:
Post a Comment