আমেরিকান ড্রিম (৪র্থ পর্ব)
রেবেকার চলে যাওয়া
লিজি রহমান
লিজি রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমেরিকায় শিক্ষকতা করতে
গেলে যে কতো বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে হয়, তা তখনো জানা ছিল না রেবেকার। তবে তিনি
এতোটুকু বুঝেছিলেন যে লক্ষ্যে উপনীত হতে হলে এডুকেশনের ওপর অনেক পড়াশোনা করতে হবে।
তার প্রথম ধাপ হিসেবে বাড়ির কাছে ইয়র্ক কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। সপ্তাহে তিনদিন
সন্ধ্যেবেলা ক্লাশ। এতোদিনে স্বামী রেস্তোঁরার কাজ ছেড়ে ইন্সুরেন্সের কাজে
ঢুকেছেন, ফলে ছেলেমেয়েকে একা রাখার সমস্যা ছিল না। অল্প অল্প ক্রেডিট নিয়ে রেবেকা
এগুতে লাগলেন। এরমধ্যে স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল ডঃ সুসান আর্বার রেবেকাকে একটি
স্টুডেন্ট টিচিংয়ের অফার দিলেন। রেবেকা তা প্রত্যাখ্যান করলেন, কারণ, ব্রংক্সয়ে
গিয়ে কাজ করাটা তার পক্ষে বেশ দুরুহ কাজ বলে মনে হয়েছিল। একেতো বাড়ি থেকে অনেক
দূর, প্রতিদিন যেতে আসতে দু’দফা টোল দিতে হবে, তারওপর ব্রংক্সয়ের পথঘাট সন্মন্ধ্যে
তার ভালো জানা নেই। এরচেয়ে বাড়ির কাছের স্কুলে প্যারা হিসেবে তিনি দিব্যি আছেন।
ফুলটাইম শিক্ষক হিসেবে যতোদিন যোগ না দিচ্ছেন, ততোদিন আর এখান থেকে নড়ছেন না।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর
হয় আরেক। ইচ্ছে না থাকলেও রেবেকাকে নড়তে হলো। যদিও তখন তিনি খ্যাতি আর সন্মানের
চূড়োয়, তবুও তাকে নড়তে হলো। স্বল্প দায়িত্বর চাকরী আর পার্টটিম পড়াশোনা নিয়ে
রেবেকার দিন ভালোই কাটছিল। এই সময়টাতেই তিনি প্রবাসী বাংলাদেশী অনেক নারী-পুরুষের
চোখে ঈর্ষার পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন। আর হবেনই বা না কেন? সাংস্কৃতিক ভূবনে তার তখন সগর্ব
এবং সশব্দ পদচারণা। ১৯৯৭ সালের কথা সেটা। এক ডাকে কখন তাকে নিউইয়ের্কের সব
বাঙ্গালি চেনে। প্রায়ই বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্যাম করছেন। শুধু তাই নয়, বেশভূষার
জন্যও তিনি নিউইয়র্কে সমধিক সুনাম অর্জন করেছেন। সংসারেও সুখশান্তি উপচে পড়ছে।
ছেলেমেয়ে দুটো একটু বড় হয়েছে। মেয়েটা হাইস্কুলে যাচ্ছে, ছেলেও মিডলস্কুলে উঠেছে,
স্বামী তখন একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে কাজ করছেন, হাতে তার পর্যাপ্ত সময়। প্রায়ই
দুজনে একসাথে বাইরে যাচ্ছেন, বাড়িতে পার্টি দিচ্ছেন। দুজনার উপার্জন ছাড়াও দেশ
থেকে উতরাধিকার সূত্রে বিরাট অংকের অর্থ পেয়েছেন। নিউইয়ের্কে বাড়ি কেনার চেষ্টা
করছেন। ঠিক সেই সময়ই রেবেকার সাথে
আমার কথা হয়। আর সেই কাহিনী নিউইয়ের্কের একটি পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। রেবেকা দেখতে রূপসী না হলেও তিনি তার
ব্যক্তিত্ব, এবং মার্জিত ব্যবহারের কারণে খুব সহজেই দশজনের মধ্যে দৃষ্টি আকর্ষণ
করতেন। সুভাষিণী, সুসজ্জিতা, রেবেকার আতিথেয়তা এবং রন্ধনশৈলীর খ্যাতিও লোকমুখে
অনেক শুনেছি, এবং তা চেখে দেখার সুযোগও আমার হয়েছে।
এই রকম যখন তিনি
খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তখন একদিন খবর পেলাম রেবেকারা সপরিবারে নিউইয়র্ক
ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বিস্মিত হয়ে গেলাম খবরটা পেয়ে। রেবেকার সাথে একদিন যোগাযোগ
করলাম। জানতে চাইলাম, বিষয়টা কি? হঠাত করে এতো সুন্দর সাজানো জীবন ফেলে কেন অজানার
পথে পা বাড়াচ্ছেন?”
রেবেকা বিষন্ন
হয়ে জানালেন, আর বোলো না, কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম।“
রেবেকার উত্তর
শুনে ততোধিক বিস্মিত আমি। “বলেন কি? আপনার মতো সুশিক্ষিতা, স্বাবলম্বী,
স্বাধীনচেতা একজন অত্যাধুনিকা মহিলাও কর্তার ইচ্ছেয় চলে!”
সামান্য হেসে
রেবেকা উত্তর দিয়েছিলেন, “ভাই রে, আমার স্বামী আমাকে যতোটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে,
আমি কেবল ততোটুকুই স্বাধীন। এর বেশী আমার যাবার উপায় নেই। জানো না, মহাভারতের
সীতার কাহিনী? তার স্বামী তার চারিদিকে একটি গন্ডী এঁকে দিয়েছিলেন, আদেশ দিয়েছিলেন
তার বাইরে না যেতে। সেকালেও সীতা অনেক সাহসী ছিলেন। স্বামীর আদেশ অমান্য করে সেই
গন্ডীর বাইরে পা দিয়েছিলেন। সেজন্য তাকে অনেক বিপদেও পড়তে হয়েছিল, সেসব ঘটনা
নিশ্চয় জানো? আমি ভাই ভীতু মানুষ, স্বামীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে এক পাও যাবার সাহস নেই
আমার। স্বামী চাকরী করার অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই চাকরী করতে পারছি, গাড়ি চালানোর
অনুমতি দিয়েছেন বলেই গাড়ি চালাতে পারছি, পড়াশোনার করার ব্যাপারে তার সন্মতি ছিল
বলেই কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি। নইলে কি এসব করতে পারতেম?”
আমি
নাছোড়বান্দার মতো বলি, “আপনার ইচ্ছে আর আগ্রহ না থাকলে কি আর এসব কোন কিছু করতে
পারতেন?”
রেবেকা বললেন, “তা
অবশ্য ঠিক, কিন্তু তুমি একবার ভেবে দেখ, তিনি যদি বাধা দিতেন, তাহলে আমি কি এসবের কোনকিছু
করতে পারতাম? সরাসরি বাধা না দিয়ে ইনডিরেক্ট অসন্মতি প্রকাশ করলেও তো আমি কোন কিছু
করতে পারতাম না। তুমি বোধহয় খেয়াল করোনি, তিনি যখন রাতে কাজ করতেন তখন আমি অনেক
সাংস্কৃতিক কাজকর্ম থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলাম। কারণ আর কিছুই নয়, দেখতাম আমি
কোথাও গেলে তার মুখোভাব গম্ভীর হয়ে যেত, সাইলেন্ট ট্রীটমেন্ট দিতে শুরু করতেন।
এমনিতে তখন ছেলেমেয়েরা ছোট ছিল, তার ওপর সংসারে অশান্তি হবে, সেসব কারণে আমি
চুপচাপ নিজের মনেই থাকতাম। কোথাও কোন কিছুতে সক্রিয়ভাবে জড়িত হতাম না। তিনি আগের
কাজ ছেড়ে সময় দিতে পারছেন বলেই এখন অনেক কিছুর সাথে জড়িত হতে পেরেছি।“
এক দমে এতোগুলো
কথা বলে রেবেকা থামলেন। আমার মুখে কোন কথা জোগালো না। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।
খালি ভাবছিলাম, কথাগুলো কি আসলেই তিনি সত্যি বললেন? অনেকক্ষণ পর কোন রকমে বললাম, “তাই
বলে কি আপনি একটুও বাধা দেবেন না? আপনার স্বামী যা বলবেন তাই মেনে নেবেন? এখানে
আপনার এতো সম্ভাবনা, এতো নামডাক, এসব ছেড়ে এক কথায় সেই কোন জংগলে চলে যাবেন?”
ম্রিয়মান হয়ে
রেবেকা বললেন, “ এক কথায় চলে যাচ্ছি কে বলল? অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তিনি
কিছুতে নিউইয়্রর্কে থাকতে রাজী নন। অগত্যা কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম।“
এরপর
স্বাভাবিকভাবেই আর আলাপ জমলো না। কিছুক্ষন এটা-সেটা এলোমেলো খুচরো আলাপ করে একসময়
নিজ গৃহে ফিরে গেলাম। এরপর আর রেবেকার সাথে দেখা হয়নি। একদিন খবর পেলাম রেবেকারা সত্যি সত্যি সপরিবারে নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে গিয়েছেন। দেখা না হলেও মন থেকে কিছুতেই রেবেকার ব্যাপারটা দূর করতে পারছিলাম
না। কেন ওর স্বামী নিউইয়র্ক ছেড়ে যাবার জন্য এমন মরিয়া হয়ে উঠেছেন? এমনতো নয় যে
তার অন্য কোন স্টেটে চাকরী বা ব্যবসা ঠিক হয়েছে! আর এখানে তো ওদের মতো ভালো
অবস্থায় খুব কম বাঙ্গালীই আছে। তাহলে কারণটা কি? একবার মনে হলো তাহলে কি রেবেকার
জনপ্রিয়তাই এর কারণ? তিনি কি ভয় পাচ্ছেন যে রেবেকা ক্রমেই বাইরের জগতে নিজের একটি পাকা আসন করে নিচ্ছেন? আর সেজন্যই কি তাকে সবকিছু থেকে সরিয়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন
যেখানে রেবেকাকে কেঊ চিনবেনা?
(চলবে)
No comments:
Post a Comment