আমেরিকান ড্রিম (২য় পর্ব)
বেশ কিছুদিন হতাশায় নিমজ্জমান থাকার পর একদিন নিঊইয়র্কের একমাত্র বাংলা পত্রিকায় একটি পার্টটাইম চাকরীর অফার পেয়ে তা লুফে নিলেন রেবেকা। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, তাকে দিয়ে হোটেল রেস্তরাঁর কাজ হবে না, আর বিনা কাগজে (গ্রীনকার্ড) কোন অফিসে ভাল কাজও জুটবে না তার। তাই নামেমাত্র বেতন হলেও (সপ্তাহে মাত্র ৫০ ডলার) কাজটা তিনি লুফে নিলেন। শত হলেও অফিসিয়াল জব, মনে একটি প্রশান্তি কাজ করল তার। ইংরেজী টাইপিংয়ে দক্ষতা থাকলেও বাংলা টাইপিংয়ের কোন ধারণাই ছিলনা রেবেকার। তবে প্রচন্ড মনোবলের ফলে তা শিখে নিতে তার বেশী সময় লাগল না। এরপর থেকে তিনিও আর দশজন বাঙ্গালির মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মন আর শ্লথদেহ নিয়ে প্রতিদিন ট্রেন ধরে ম্যানহাটানে যাওয়া-আসা করতে লাগলেন। মাথার মধ্যে তার আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনা।
ততোদিনে ছেলেমেয়েরা একটু বড় হয়েছে, নিঊইয়র্কে আরো অনেক বাঙ্গালির আগমন হয়েছে, আরো অনেকের সাথে তার পরিচয় হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই রেবেকা একটি ভালো কাজের সন্ধান পেলেন। তারই এক বান্ধবীর বোন তাকে খবরটা এনে দিল। তার ল'ইয়ার, রোলান্ড গেল, তার ল অফিসের জন্য একজন বাঙ্গালি মেয়ে খুঁজছে। ভালো ইংরেজী আর টাইপ জানতে হবে। আমেরিকায় লিগ্যালি না থাকলেও অসুবিধে নেই। বেতন সপ্তাহে সাড়ে তিনশ ডলার, নগদ দেবে। জাতিসংঘের সপ্তাহে পাঁচশ ডলারের থেকে অনেক কম হলেও পত্রিকা অফিসের সপ্তাহে ৫০ ডলার বেতনের তুলনায় তো অনেক! তারপর অফিস জব। রেবেকার ভাগ্যে কি সত্যি শিকে ছিঁড়তে যাচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে রেবেকা সেই ল'ইয়ারের সাথে যোগাযোগ করলেন। একটি ইন্টারভিঊ ডেটও ঠিক হল।
দুরু দুরু বুকে নির্দিষ্ট দিনে সেই অফিসে গিয়ে হাজির হলেন রেবেকা। ফেডারেল প্লাজার ঠিক সামনেই অফিস। বিশাল বিল্ডিং, ভেতরে ঢুকে রেবেকার তাক লেগে গেল। লবিতে গার্ড, দেয়ালে পেতলের ফ্রেমে সারি সারি অফিসের নাম লেখা। তিনতলায় অফিসে ঢুকে রেবেকার তাক লেগে গেল। তিন/চারজন আমেরিকান ল'ইয়ার একই অফিসে বসেন। ওয়েটিং রুমের কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরে কয়েকজন স্প্যানিশ সেক্রেটারী। জানালার সামনে বসা রিসেপশনিস্ট মেয়েটিও স্প্যানিশ। তুখোর ইংরেজী বলছে তারা, তাদের পোশাকে-আশাকে দারুণ স্মার্টনেস আর চলনে-বলনে প্রচন্ড ক্ষিপ্রতা। কালো কুঁচি দেয়া দীর্ঘ স্কার্ট আর সাদা সূতির শার্টে ওদের পাশে রেবেকাকে জবুথবু লাগছিল। প্রচুর বাংলাদেশী, পাকিস্তানী আর ভারতীয় ক্লায়েন্ট রোলান্ডের। বাঙ্গালি ক্লায়েন্টদের সুবিধার্থেই তার একজন বাঙ্গালি সেক্রেটারী দরকার। চাকরীতে রেবেকার অতীত অভিগ্যতা, ইংরেজী ও বাংলা ভাষায় পারদর্শি্তা এবং টাইপিংয়ের ক্ষিপ্রতা, সব মিলিয়ে রেবেকা কাজটি পেয়ে গেলেন। কাজটি পাবার পর নিজের ভাগ্যকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ৫০ থেকে একেবারে ৩৫০ ডলার! তার ওপর কিনা গ্রীনকার্ড ছাড়াই!! আর তাও কিনা এমন একটি হাই-ফাই অফিসে!!! বিধি কি সত্যি তার দিকে মুখ ফিরে চেয়েছে?? বাড়ি ফেরার পথে রেবেকার দু'চোখ বেয়ে অঝোরে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল। ব্যস্ত ট্রেনের ততোধিক ব্যস্ত যাত্রীদের কেঊ তা লক্ষ্যও করল না।
এরপরের ইতিহাস ঊজ্জ্বল। ছেলেমেয়ে দুটো আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। পরিচয়ের গন্ডি আরো বেড়েছে। বাড়ি সাজিয়েছেন মনের মতো করে। ঢাকা বেতারে কাজ করার সুবাদে কৌশিক আহমেদের সাথে পরিচয় ছিল, তিনি নিউইয়র্কে তার বাংলা রেডিও অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণে আমন্ত্রণ জানালেন। সেই সুবাদে নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক জগতে পরিচিতি হল। দেশে থাকতেই গাড়ি চালানো শিখেছিলেন, এখন নিজের গাড়ি কিনলেন। ল'অফিসে কয়েক বছর কাজ করার পর একদিন রেবেকাদের গ্রীনকার্ড ইন্টারভিঊয়ের ডেট এল। দশ বছর পর এই প্রথম সপরিবারে রেবেকা দেশে এলেন ইন্টারভিঊ দিতে। এক মাস পর যখন আমেরিকা ফিরলেন, তখন তিনি আর অবৈধ নন। গ্রীনকার্ডধারী। আহ, সে এক কী আনন্দময় অনূভূতি! জীবনের মানেই যেন বদলে গেলো। এতোগুলো বছর যা করতে পারেননি, এখন তা করতে পারবেন। আমেরিকায় ফিরেই সিটি জবের জন্য আবেদন করলেন রেবেকা।
(চলবে)
রেবেকার মনোবল
লিজি রহমান
লিজি রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
রেবেকার স্বামী অবশ্য অনেক দিন আগেই তার কর্মস্থল থেকে গ্রীনকার্ডর জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সেই গ্রীনকার্ড পেতে কতদিন লাগবে, তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। সে প্রর্যন্ত কি তিনি এদেশে অবৈধ এবং বেকার জীবন কাটাবেন!! জাতিসংঘের চাকরীটা চলে যাবার পরও রেবেকা আকুল হয়ে প্রতিদিন কুইন্স থেকে ম্যানহাটানে দৌড়াতে লাগলেন। কখনো জাতিসংঘের
সদর দফতর, কখনো আমেরিকান কন্সুলেট, কখনো বা বাংলাদেশ মিশন। ভেসে থাকার
চেষ্টায় খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করতে থাকলেন তিনি। জাতিসংঘের
ভিসা সেকশন থেকে বলা হল, তাদের আর এ ব্যাপারে কিছু করার নেই, আমেরিকান
কন্সুলেটে গিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারো, তাদের হাতেই এখন সবকিছু। রেবেকা
সেখানে গেলেন। আমেরিকান ভিসা অফিসারটি অতীব ভদ্র, তিনি ভরসা দিয়ে বললেন,
যদি এখানে যে কোন দেশের কন্সুলেট থেকে তোমাকে একটি চিঠি দিয়ে বলে যে তারা
তোমাকে কাজ দেবে, তাহলে আমরা তোমাকে ভিসা দিতে পারব। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ
কন্সুলেটের একজন ফার্স্ট সেক্রেটারীর সাথে তার পরিচয় ছিল, বাবার বন্ধুর
ছেলে, একই পাড়ায় তাদের বসবাস ছিল, কৈশোরে একসাথে রেডিওতে তারা ডিবেটও
করেছেন। রেবেকাই সেসময় তাকে ডিবেটে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাই ভরসা ছিল
তাকে বললে হয়তো কাজ হবে। সে নিশ্চয় রেবেকাকে একটি নিয়োগপত্র দেবে। কিন্তু
দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর একদিন সে না করে দিল। সেদিন রেবেকার মনে হয়েছিল, তার
মতো হতভাগী এই জগতে আর একটিও নেই। তার চোখের সামনে থেকে সব স্বপ্ন মুছে
গিয়েছিল। তূষার আচ্ছাদিত নিঊইয়র্কের ধুষর প্রকৃতির মতো তার ভবিষ্যতও যেন ধুষর হয়ে গেল।বেশ কিছুদিন হতাশায় নিমজ্জমান থাকার পর একদিন নিঊইয়র্কের একমাত্র বাংলা পত্রিকায় একটি পার্টটাইম চাকরীর অফার পেয়ে তা লুফে নিলেন রেবেকা। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, তাকে দিয়ে হোটেল রেস্তরাঁর কাজ হবে না, আর বিনা কাগজে (গ্রীনকার্ড) কোন অফিসে ভাল কাজও জুটবে না তার। তাই নামেমাত্র বেতন হলেও (সপ্তাহে মাত্র ৫০ ডলার) কাজটা তিনি লুফে নিলেন। শত হলেও অফিসিয়াল জব, মনে একটি প্রশান্তি কাজ করল তার। ইংরেজী টাইপিংয়ে দক্ষতা থাকলেও বাংলা টাইপিংয়ের কোন ধারণাই ছিলনা রেবেকার। তবে প্রচন্ড মনোবলের ফলে তা শিখে নিতে তার বেশী সময় লাগল না। এরপর থেকে তিনিও আর দশজন বাঙ্গালির মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মন আর শ্লথদেহ নিয়ে প্রতিদিন ট্রেন ধরে ম্যানহাটানে যাওয়া-আসা করতে লাগলেন। মাথার মধ্যে তার আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনা।
ততোদিনে ছেলেমেয়েরা একটু বড় হয়েছে, নিঊইয়র্কে আরো অনেক বাঙ্গালির আগমন হয়েছে, আরো অনেকের সাথে তার পরিচয় হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই রেবেকা একটি ভালো কাজের সন্ধান পেলেন। তারই এক বান্ধবীর বোন তাকে খবরটা এনে দিল। তার ল'ইয়ার, রোলান্ড গেল, তার ল অফিসের জন্য একজন বাঙ্গালি মেয়ে খুঁজছে। ভালো ইংরেজী আর টাইপ জানতে হবে। আমেরিকায় লিগ্যালি না থাকলেও অসুবিধে নেই। বেতন সপ্তাহে সাড়ে তিনশ ডলার, নগদ দেবে। জাতিসংঘের সপ্তাহে পাঁচশ ডলারের থেকে অনেক কম হলেও পত্রিকা অফিসের সপ্তাহে ৫০ ডলার বেতনের তুলনায় তো অনেক! তারপর অফিস জব। রেবেকার ভাগ্যে কি সত্যি শিকে ছিঁড়তে যাচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে রেবেকা সেই ল'ইয়ারের সাথে যোগাযোগ করলেন। একটি ইন্টারভিঊ ডেটও ঠিক হল।
দুরু দুরু বুকে নির্দিষ্ট দিনে সেই অফিসে গিয়ে হাজির হলেন রেবেকা। ফেডারেল প্লাজার ঠিক সামনেই অফিস। বিশাল বিল্ডিং, ভেতরে ঢুকে রেবেকার তাক লেগে গেল। লবিতে গার্ড, দেয়ালে পেতলের ফ্রেমে সারি সারি অফিসের নাম লেখা। তিনতলায় অফিসে ঢুকে রেবেকার তাক লেগে গেল। তিন/চারজন আমেরিকান ল'ইয়ার একই অফিসে বসেন। ওয়েটিং রুমের কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরে কয়েকজন স্প্যানিশ সেক্রেটারী। জানালার সামনে বসা রিসেপশনিস্ট মেয়েটিও স্প্যানিশ। তুখোর ইংরেজী বলছে তারা, তাদের পোশাকে-আশাকে দারুণ স্মার্টনেস আর চলনে-বলনে প্রচন্ড ক্ষিপ্রতা। কালো কুঁচি দেয়া দীর্ঘ স্কার্ট আর সাদা সূতির শার্টে ওদের পাশে রেবেকাকে জবুথবু লাগছিল। প্রচুর বাংলাদেশী, পাকিস্তানী আর ভারতীয় ক্লায়েন্ট রোলান্ডের। বাঙ্গালি ক্লায়েন্টদের সুবিধার্থেই তার একজন বাঙ্গালি সেক্রেটারী দরকার। চাকরীতে রেবেকার অতীত অভিগ্যতা, ইংরেজী ও বাংলা ভাষায় পারদর্শি্তা এবং টাইপিংয়ের ক্ষিপ্রতা, সব মিলিয়ে রেবেকা কাজটি পেয়ে গেলেন। কাজটি পাবার পর নিজের ভাগ্যকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ৫০ থেকে একেবারে ৩৫০ ডলার! তার ওপর কিনা গ্রীনকার্ড ছাড়াই!! আর তাও কিনা এমন একটি হাই-ফাই অফিসে!!! বিধি কি সত্যি তার দিকে মুখ ফিরে চেয়েছে?? বাড়ি ফেরার পথে রেবেকার দু'চোখ বেয়ে অঝোরে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল। ব্যস্ত ট্রেনের ততোধিক ব্যস্ত যাত্রীদের কেঊ তা লক্ষ্যও করল না।
এরপরের ইতিহাস ঊজ্জ্বল। ছেলেমেয়ে দুটো আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। পরিচয়ের গন্ডি আরো বেড়েছে। বাড়ি সাজিয়েছেন মনের মতো করে। ঢাকা বেতারে কাজ করার সুবাদে কৌশিক আহমেদের সাথে পরিচয় ছিল, তিনি নিউইয়র্কে তার বাংলা রেডিও অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণে আমন্ত্রণ জানালেন। সেই সুবাদে নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক জগতে পরিচিতি হল। দেশে থাকতেই গাড়ি চালানো শিখেছিলেন, এখন নিজের গাড়ি কিনলেন। ল'অফিসে কয়েক বছর কাজ করার পর একদিন রেবেকাদের গ্রীনকার্ড ইন্টারভিঊয়ের ডেট এল। দশ বছর পর এই প্রথম সপরিবারে রেবেকা দেশে এলেন ইন্টারভিঊ দিতে। এক মাস পর যখন আমেরিকা ফিরলেন, তখন তিনি আর অবৈধ নন। গ্রীনকার্ডধারী। আহ, সে এক কী আনন্দময় অনূভূতি! জীবনের মানেই যেন বদলে গেলো। এতোগুলো বছর যা করতে পারেননি, এখন তা করতে পারবেন। আমেরিকায় ফিরেই সিটি জবের জন্য আবেদন করলেন রেবেকা।
(চলবে)
No comments:
Post a Comment